বাংলা শেখানোর সময় আমরা কেন ইংরেজি ব্যবহার করি না? Why don't we use English in Bangla sessions?
টিউটরদের জন্য:
একজন টিউটর হিসেবে কোনো শিক্ষার্থীকে পড়ার মাঝে আটকে যেতে দেখলে সাহায্য করাটা খুবই স্বাভাবিক। শিক্ষার্থী যখন থমকে গিয়ে বলে, "মানে কী?", তখন একটা ইংরেজি শব্দ বলে দেওয়াটাই সবচেয়ে সহজ মনে হয়।
তাতে মনে হতে পারে কাজটা সহজ হলো—শিক্ষার্থী মাথা নাড়ল, পড়া এগোলো এবং সেশনও ঠিকঠাক চলল।
কিন্তু আমরা যখনই কোনো বাংলা শব্দের ইংরেজি অনুবাদ করে দিই, তখনই আমরা অজান্তে শিক্ষার্থীর সাবলীলভাবে ভাষা শেখার পথ বন্ধ করে দিই।
নিচে সহজভাবে আলোচনা করা হলো কেন সেশনে ইংরেজি এড়িয়ে যাওয়া জরুরি এবং কেন আমাদের পদ্ধতি কেবল বাংলা ব্যবহারের ওপর জোর দেয়:
১. মাথায় সরাসরি ছবি তৈরি করা, মনে মনে অনুবাদ নয়
Elevate Bangla টিউটর হিসেবে আপনার প্রধান কাজ কিন্তু বাংলা শব্দ ব্যাখ্যা করা নয়। আপনার কাজ হলো শিক্ষার্থীর মাথায় বাংলা শব্দের সাথে সেই জিনিস বা কাজের একটি সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করে দেওয়া।
[ বাংলা শব্দ ] ════════════► [ চোখের সামনের ছবি বা জিনিস ]
(সরাসরি সম্পর্ক)
কিন্তু শিক্ষার্থী যখন ইংরেজির সাহায্য নেয়, তখন তার মাথায় অন্য একটা ঝামেলা তৈরি হয়:
[ বাংলা শব্দ ] ─—-------------─► [ ইংরেজি শব্দ ] ─—---------─► [ চোখের সামনের ছবি বা জিনিস ]
(বাড়তি বাধা)
এই মনে মনে অনুবাদ করার অভ্যাসটি কথা বলার গতি কমিয়ে দেয়। প্রতিটি বাংলা শব্দ শুনে শিক্ষার্থী যদি প্রথমে সেটাকে ইংরেজিতে বদলায়, তবে সে কখনোই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলতে পারবে না। আমরা চাই শিক্ষার্থী সরাসরি বাংলার মাধ্যমেই সবকিছু চিন্তা করুক।

২. কথা দিয়ে শুধু শব্দ প্রকাশ পায় না, সংস্কৃতিও প্রকাশ পায়
ইংরেজি এড়িয়ে চলার আরও একটি বড় কারণ হলো—একটি ভাষার সব শব্দের সাথে অন্য ভাষার শব্দের পুরোপুরি মিল থাকে না। প্রতিটি শব্দ তার নিজের সংস্কৃতি ও ব্যবহার থেকেই আসল অর্থ খুঁজে পায়।
যখন কোনো শিক্ষার্থী কেবল ইংরেজি অনুবাদের ওপর নির্ভর করে বাংলা শেখে, তখন সে বাংলা শব্দ ব্যবহার করলেও তার ভাব বা কথা বলার ধরনটি একদম বিদেশিদের মতো শোনায়। বাংলায় সরাসরি চিন্তা করতে পারলে শিক্ষার্থী কেবল শব্দ শেখে না, বরং দেশের সংস্কৃতি ও ব্যবহারের আসল ভাবটাও বুঝতে পারে।
৩. অনুবাদ কেবল সাময়িক স্বস্তি দেয়
কোনো অজানা বাংলা শব্দের ইংরেজি অনুবাদ বলে দিলে সাময়িকভাবে মনে হয় শিক্ষার্থী পড়াটা বুঝে গেছে:
১. শিক্ষার্থী ইংরেজি শব্দটি শোনে এবং ভাবে, "হ্যাঁ, আমি বুঝেছি!" ২. টিউটর ও শিক্ষার্থী পরের কথায় চলে যান। ৩. আসল সমস্যা: শিক্ষার্থী কিন্তু সেই বাংলা শব্দটির উচ্চারণ বা রূপটাই ভুলে গেছে, যা শুনে সে আটকে গিয়েছিল! ইংরেজি শব্দটি মনে গেঁথে যায়, আর বাংলা শব্দটি আবছা হয়ে হারিয়ে যায়।
সে আসলে বাংলা শব্দটি শিখল না, কেবল একটা ইংরেজি শব্দ দিয়ে সেটাকে ঢেকে দিল। কিছুক্ষণ পর একই বাংলা শব্দ আবার সামনে এলে সে আবার আটকে যাবে, কারণ তার মাথায় শব্দটি স্থায়ী হয়নি।
৪. ‘জিপিএ’ (GPA) উপায়/পদ্ধতি যেভাবে কাজ করে
আমাদের শেখানোর নিয়মগুলো এমনভাবে তৈরি, যাতে অনুবাদ ছাড়াই শিক্ষার্থী সব বুঝতে পারে:
Phase 1-2, প্রথম ও দ্বিতীয় ফেজ (পর্যায়): শিক্ষার্থী নতুন বাংলা শব্দকে সরাসরি হাতের ইশারা, আসল জিনিস বা ছবির সাথে মিলিয়ে শেখে। মাঝখানে কোনো ইংরেজি থাকে না।
Phase 3-5, তৃতীয় ফেজ (পর্যায়): আগের সহজ শব্দগুলো শেখা হয়ে গেলে, শিক্ষার্থী তার জানা বাংলা দিয়েই নতুন বাংলা শব্দ শিখতে পারে।
সেশনজুড়ে কেবল বাংলা ব্যবহার করলে শিক্ষার্থীর মাথা সবসময় "বাংলা মোডে" কাজ করতে শেখে।
৫. যাদের মাতৃভাষা ইংরেজি নয়, তাদের কষ্ট আরও বেশি
ইংরেজি অনুবাদ করা যেকোনো শিক্ষার্থীর জন্যই ক্ষতিকর, তবে শিক্ষার্থীর মাতৃভাষা যদি ইংরেজি না হয়, তবে সমস্যা আরও বাড়ে।
আপনি যদি অন্য ভাষার কোনো শিক্ষার্থীকে ইংরেজির মাধ্যমে বাংলা বোঝান, তবে তার মাথায় অতিরিক্ত দুটি ধাপ যোগ হয়:
[ বাংলা শব্দ ] ─—---─► [ ইংরেজি শব্দ ] ─—--─► [ নিজস্ব ভাষা ] ─—---─► [ মূল জিনিস ]
(২টি বাড়তি ধাপ!)
একটি সহজ শব্দের জন্য শিক্ষার্থীকে তিনটি ধাপ পার হতে হয়। এতে মাথা ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং বাংলা শেখার গতি একদম কমে যায়।

‘বাংলিশ’ ও বিদেশি শব্দ ব্যবহারের কিছু কথা
সেশনে ইংরেজি ব্যবহার করতে নিষেধ করার মানে কিন্তু এই নয় যে, বাংলায় চলা বিদেশি শব্দগুলো একদম বাদ দিয়ে দিতে হবে।
আধুনিক বাংলা ভাষায় এমন অনেক ইংরেজি বা বিদেশি শব্দ মিশে গেছে, যা রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক—সবাই প্রতিদিন ব্যবহার করেন। কোনো শব্দ যখন সাধারণ বাংলায় পুরোপুরি মিশে যায়, তখন শিক্ষার্থীদের সেটি শেখাই ভালো। তবে তা শেখাতে হবে বাংলা উচ্চারণে এবং সাধারণ মানুষ যেভাবে বলেন ঠিক সেভাবে।
এর পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে:
বইয়ের কঠিন শব্দ এড়িয়ে চলা: কোনো শিক্ষার্থী যদি অভিধান দেখে ‘টেবিল’ শব্দের বদলে ‘ফলক’ বলা শুরু করে, তবে সাধারণ মানুষের কাছে তার কথা বেশ অদ্ভুত শোনাবে। কারণ দৈনন্দিন জীবনে বাংলাভাষীরা সহজভাবে ‘টেবিল’-ই বলে থাকেন।
শব্দের স্থানীয় অর্থ পরিবর্তন: অনেক সময় কোনো ইংরেজি শব্দ বাংলায় এসে তার মূল অর্থ কিছুটা বদলে ফেলে। যেমন—ইংরেজিতে "gossip" বলতে অন্যের নামে পরচর্চা বা নিন্দা করা বোঝায়, যা একটি খারাপ কাজ। কিন্তু আমাদের দেশে "গসিপ করা" বলতে বোঝায় সাধারণ গল্পগুজব করা বা আড্ডা মারা। এই কথাটির মাঝে খারাপ কিছু নেই।
সবাই যে শব্দগুলো নিয়মিত ব্যবহার করেন, সেগুলোর জায়গায় যদি কঠিন অভিধানের শব্দ শেখানো হয়, তবে শিক্ষার্থী কখনোই স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারবে না। তাই বাংলাদেশে মানুষ প্রতিদিন যেভাবে কথা বলেন, শিক্ষার্থীদের সেভাবেই শেখাতে হবে!
টিউটরদের জন্য শেষ কথা
শিক্ষার্থী কোনো শব্দ মনে করতে না পারলে ইংরেজি না বলে চুপ থাকা বা অন্যভাবে বোঝানো একটু কঠিন হতে পারে। কিন্তু পুরো সেশন বাংলায় রাখা—ছবি দেখানো, অভিনয় করা বা সহজ বাংলায় বুঝিয়ে বলা—শিক্ষার্থীর মাথাকে সত্যি সত্যি ভাষাটা শিখতে সাহায্য করে।
পরের বার শিক্ষার্থী আটকে গেলে ইংরেজি বলে দেওয়ার ইচ্ছাটি সামলে নিন। তাকে ছবি দেখান বা ইশারায় বোঝান। আপনি তাকে কষ্ট দিচ্ছেন না, বরং তাকে সুন্দরভাবে বাংলা বলতে সাহায্য করছেন।




Comments