top of page
Search

ভাষার আইসবার্গ কী?

  • melissa57089
  • Mar 6
  • 3 min read

আপনারা যারা ভাষাশিক্ষা নিয়ে ভাবছেন, আপনাদের সাথে একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি শেয়ার করতে চাই। ভাষাবিজ্ঞানীরা প্রায়ই আমাদের মানসিক শব্দভাণ্ডারকে (Mental Lexicon)—অর্থাৎ আমাদের মস্তিষ্কে জমা থাকা শব্দের অভিধানকে—একটি বিশাল আইসবার্গ (হিমশৈল) বা বরফখণ্ডের সাথে তুলনা করেন।


শব্দভাণ্ডারের দুটি ভাগ

১. আইসবার্গের চূড়া (যা পানির উপরে দেখা যায়): যে শব্দগুলো আমরা পুরোপুরি আয়ত্ত করেছি এবং চাইলেই চট করে কথা বলার সময় ব্যবহার করতে পারি। এগুলো খুব মজবুতভাবে আমাদের মাথায় গেঁথে আছে। প্রতিদিনের কথাবার্তায় (যেমন: রিকশা ঠিক করা, দোকানে গিয়ে কিছু কেনা বা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া) আমরা অনায়াসেই এই শব্দগুলো ব্যবহার করি।

২. আইসবার্গের ভিত্তি (পানির নিচের অংশ): এটি আইসবার্গের সেই অদৃশ্য অথচ বিশাল অংশ। পড়াশোনা বা জটিল কোনো বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাতে যে গভীর আর প্রাতিষ্ঠানিক শব্দের প্রয়োজন হয়, সেগুলো মূলত এখানেই জমা থাকে। আমাদের এই "নিষ্ক্রিয়" শব্দভাণ্ডারকে আবার বিভিন্ন স্তরে ভাগ করা যায়:

·       পানির ঠিক নিচে: যে শব্দগুলো শোনামাত্রই আমরা চিনতে পারি, যদিও নিজেরা খুব একটা বলি না।

·       মাঝারি গভীরে: যে শব্দগুলো নির্দিষ্ট কোনো প্রসঙ্গের মধ্যে থাকলে আমরা বুঝতে পারি।

·       গভীর তলদেশে: যে শব্দগুলো সম্পর্কে আমাদের আবছা ধারণা আছে, কিন্তু পুরোপুরি বুঝতে হলে আমাদের বেশ সাহায্যের প্রয়োজন হয়।

মাতৃভাষার দক্ষতাও কিন্তু ঠিক এভাবেই কাজ করে। যেমন ধরুন, আপনারা যারা বাংলাভাষী যখন রবীন্দ্রনাথ বা শরৎচন্দ্রের কোনো উপন্যাস পড়েন, তখন এমন অনেক শব্দ পান যেগুলোর মানে আপনারা ঠিকই বোঝেন, কিন্তু সাধারণ আড্ডায় সেগুলো কখনোই ব্যবহার করেন না। আপনাদের আইসবার্গের চূড়ায় থাকা শব্দগুলোই সম্ভবত আপনারা ছোটবেলায় সবার আগে শিখেছিলেন। মনে রাখবেন, এই শব্দগুলো কিন্তু সরাসরি চূড়ায় আসেনি; বরং আগে একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি হয়েছে এবং সময়ের সাথে সাথে শব্দগুলো উপরে ভেসে উঠেছে।

"একবারেই শিখে ফেলার" ভুল ধারণা

দ্বিতীয় কোনো ভাষা শেখার সময় আমরা অনেক শিক্ষার্থীই হতাশ হয়ে পড়ি। আমাদের প্রত্যাশা থাকে যে, কোনো শব্দ একবার শোনা বা পড়ার সাথেই আমরা তাতে দক্ষ হয়ে যাব। আমরা জোর করে শব্দগুলোকে পানির উপরে অর্থাৎ "চূড়ায়" নিয়ে আসার চেষ্টা করি। আর যখন মনে পড়ে না, তখন নিজেকে বকা দেই— "এই শব্দটা তো গতকালই শিখলাম! কেন মনে নেই?"

আসলে এভাবে ভাষা শেখার চেষ্টা করাটা ক্লান্তিকর এবং অকার্যকর। যখন আমরা অল্প কিছু শব্দের তালিকা মুখস্থ করার চেষ্টা করি, দেখা যায় দুদিন পরেই সেগুলো আর মনে নেই। এর কারণ হলো, আমরা আইসবার্গের শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি না করেই কেবল এর চূড়াটা বানানোর চেষ্টা করছি।

গ্রোয়িং পার্টিসিপেটরি অ্যাপ্রোচ (GPA)

একবারে অল্প কিছু শব্দ জোর করে মনে রাখার বদলে Growing Participatory Approach (GPA) পন্থাটি একটি মজবুত ভিত্তি তৈরির উপর জোর দেয়। এর লক্ষ্য হলো আইসবার্গের "তলার দিকে" প্রচুর পরিমাণে নতুন শব্দ জমা করা। আর এটি করা হয় 'শক্তিশালী সংযোগ' বা Strong Encounters-এর মাধ্যমে।

একটি শব্দ আমাদের শব্দভাণ্ডারে যুক্ত হয় তখন, যখন আমরা কোনো অর্থপূর্ণ পরিস্থিতিতে বা গল্পের ভেতরে শব্দটি মনোযোগ দিয়ে শুনি। হয়তো শব্দটি এখনই বলতে পারব না, কিন্তু এটি আমাদের শব্দভাণ্ডারে জায়গা করে নিয়েছে। যতবার আমরা শব্দটি কোনো গল্পে বা বাস্তব কথোপকথনে শুনব, এটি তত বেশি হালকা হবে এবং ধীরে ধীরে পানির উপরে ভেসে উঠবে।

টিউটরের ভূমিকা এবং স্পেসড রিপিটিশন (Spaced Repetition)

টিউটর হিসেবে আপনাদের কাজ হলো এই 'শক্তিশালী সংযোগ' তৈরিতে সাহায্য করা। বিভিন্ন অডিও বা ভিডিও রেকর্ডিয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের আইসবার্গের গভীরে নতুন নতুন শব্দ জমা করতে থাকে। এই শব্দগুলোকে উপরে তুলে আনার জন্য আমরা ব্যবহার করি Spaced Repetition। দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতির জন্য এটি একটি জাদুর মতো কাজ করে:

·       একদিনে দীর্ঘ সময়ের তুলনায়, বিরতি দিয়ে বারবার ঝালাই করা অনেক বেশি কার্যকর।: টানা এক ঘণ্টা মুখস্থ করার চেয়ে দিনে ৫-১০ মিনিট করে কয়েকবার (একবার সেদিনই, কয়েকদিন পর, তারপর এক সপ্তাহ পর) নিয়মিত ঝালাই করা ফলপ্রসূ। 

·       মস্তিষ্কের স্নায়বিক পথ শক্তিশালী করা: বারবার বিরতি দিয়ে দেখা বা শোনার ফলে শব্দটি ধীরে ধীরে পানির উপরে উঠে আসে এবং একসময় এটি ব্যবহার করা আমাদের জন্য একদম সহজ হয়ে যায়।

দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন

পরের বার যখন কোনো শিক্ষার্থী নতুন কোনো শব্দ মনে করতে গিয়ে হিমশিম খাবে, তখন তাকে নিরুৎসাহিত না করে বরং অনুপ্রাণিত করা উচিত। কারণ, শব্দটি মনে করার চেষ্টা করাই প্রমাণ করে যে শব্দটির সাথে তার একটি শক্তিশালী সংযোগ তৈরি হয়েছে। এর মানে হলো, শব্দটি ইতিমধ্যে তার আইসবার্গের অংশ হয়ে গেছে; এটি এখন শুধু পানির নিচে আছে। শব্দটি মনে করার এই চেষ্টাই শব্দটিকে আরও হালকা করবে এবং উপরে ভেসে উঠতে সাহায্য করবে।

আমাদের উচিত শিক্ষার্থীর ওপর ধৈর্য ধরা। চলুন, আমরা শিক্ষার্থীদের ভাষার আইসবার্গ বড় করতে সাহায্য করি এবং নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে শব্দগুলোকে পানির ওপরে নিয়ে আসি। ভাষা শেখানোর এই প্রক্রিয়ায় আপনাদের অভিজ্ঞতা কী বলে? এ বিষয়ে আপনাদের সুচিন্তিত মতামত জানতে পারলে আমি খুব খুশি হব।

 
 
 

Comments


bottom of page